ডায়াবেটিসের কারণ এবং প্রতিরোধের কিছু কার্যকরী ও সেরা উপায়
ডায়াবেটিস বর্তমান বিশ্বের মানুষদের সবচেয়ে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা গুলোর একটি। বিশ্বে মহামারির রূপ নিয়েছে ডায়াবেটিস। মানুষ প্রতিনিয়ত এবং প্রায় অনেকে কম বয়সেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। এই আর্টিকেলে ডায়াবেটিসের কারণ, লক্ষণ এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে আপনাদের একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।
ডায়াবেটিস কি ?
ডায়াবেটিস হল একটি ক্রনিক বা দীর্ঘ সময়ের স্বাস্থ্য অবস্থা। আপনার শরীর কতটুকু পরিমাণ খাবারকে শক্তিতে রুপান্তর করতে পারে তার দীর্ঘসময়ের একটা পরিসংখ্যান হল ডায়াবেটিস।
আপনার গ্রহণকৃত খাদ্যকে শরীর প্রথমে চিনিতে রুপান্তর করে। তারপর সেটা আপনার রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে দেয়। যখন আপনার শরীরে চিনি অতিরিক্ত হয়ে যায় তখন শরীরের মধ্যে থাকা যকৃত ইনসুলিন নামক হরমোন নিঃসরণ করে। অর্থাৎ ইনসুলিন শরীরে চিনির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে ডায়াবেটিস হল তার বিপরীত অবস্থা।
ডায়বেটিস হলে আপনার শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপন্ন করতে পারবে না এবং শরীরে চিনির মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাবে। যার কারণে হার্টের অসুখ, কিডনির রোগ সহ দৃষ্টি শক্তি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এই সব কিছুর মুলেই কিন্তু চিনির পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া দায়ী যার অপর নাম ডায়াবেটিস।
এখনো পর্যন্ত ডায়াবেটিস সমূলে দুর করা যায় এমন কোনো মেডিসিন আবিষ্কৃত হয় নি তবে যেসব রোগ মানুষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেসব রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস সবার উপরে। বেশিরভাগ ডায়াবেটিস রোগী নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সুস্থ সবল জীবনযাপন করে। ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া সহ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জীবনযাপন করতে পারলে দীর্ঘ সময়ে ডায়াবেটিস এর কোনো প্রভাব শরীরে পড়ে না।
ডায়াবেটিস এর প্রকারভেদ
টাইপ-১ ডায়াবেটিস
টাইপ-১ ডায়াবেটিস ডায়াবেটিস এর সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায়। সাধারণত ৫-১০ পার্সেন্ট ডায়াবেটিস রোগী টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিস এর এই ধরনটা মারাত্মক বলার কারণ হলো শরীরে একদমই ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না এই টাইপের রোগীদের। তাদের প্রত্যেকদিনই ইনজেকশনে ইনসুলিন নিতে হয়। সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা এর প্রভাব খুব তাড়াতাড়ি দেখা পেতে শুরু করে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস
টাইপ-২ ডায়াবেটিস হলো ডায়াবেটিস এর সাধারণ প্রকার। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক থেকে শুরু করে শিশু, কিশোর এমনকি যুবকদেরও টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৯০-৯৫ শতাংশ এই প্রকারের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দীর্ঘ সময় নিয়ম তান্ত্রিক উপায়ে চললে এই ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। দৈনন্দিন কাজকর্ম,ওজন কমানো এবং সব সময় কর্মঠ থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস শরীরের জন্য তেমন কিছুই না। সাধারণত অধিকাংশ রোগীই টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়েছে সেটার লক্ষণ বুঝতে পারে না। রক্তে চিনির মাত্রা চেক করতে তাই নিয়মিত ব্লাড টেস্ট করা জরুরি।
জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস
কোন একজন মহিলার ডায়াবেটিস নেই কিন্তু গর্ভাবস্থায় এই ডায়াবেটিস তার হতে পারে তাই এটি জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস। বাচ্চার জন্ম নেওয়ার পর তার এই ডায়াবেটিস চলে যায় কিন্তু সেই বাচ্চাটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার রিস্ক ফ্যাক্টরে থাকে এবং বাচ্চাটি শিশু অবস্থায় অতিরিক্ত ওজনের হতে পারে যেটি পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ যেভাবে বুঝবেন
নিচের লক্ষণ গুলোর মধ্যে যদি কোন একটি লক্ষণও আপনার মধ্যে দেখা যায় তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা জরুরি
- খুব বেশি প্রস্রাব হওয়া বিশেষ করে রাতে
- বেশি তেষ্ঠা পাওয়া বা নিজেকে বেশি তৃষ্ণার্ত মনে হওয়া
- ওজন কমানোর আপনার কোন চেষ্টা না থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া
- চোখে ঝাপসা দেখা
- পা অথবা হাত অসাড় মনে হওয়া
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
অতিরিক্ত বমি বমি ভাব পেটে ব্যথা ইত্যাদি ডায়াবেটিসের টাইপ-১ এর লক্ষণ। এসব লক্ষণ সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই দেখা দিতে পারে। জীবনের যেকোনো সময় লক্ষণগুলোর হঠাৎ করে জন্ম হতে পারে কারণ এসব টাইপ-১ ডায়াবেটিসের লক্ষণ। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ গুলো তৈরি হতে বেশি সময় নেয়। টাইপ-২ এ আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীর ছেলেবেলা থেকেই এসব সিম্পটম তৈরি হতে শুরু করে এবং সে যখন পূর্ণবয়স্ক হয় তখন লক্ষণগুলো আত্মপ্রকাশ করে। তাই টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ গুলো ধরা যায় না। এক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ব্লাডের সুগার টেস্ট করাটা ভালো।
ডায়াবেটিসের কারণসমূহ
মানুষের অগ্ন্যাশয়ের বেটা কোষ থেকে ইনসুলিন উৎপন্ন হয়। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিকারক ইনফেকশনকে প্রতিরোধ করার সময় অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপন্নকারী কোষ বেটাকেও আক্রান্ত করে এবং ধ্বংস করে ফেলে। তখন রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় ইনসুলিন হরমোন অগ্ন্যাশয় উৎপন্ন করতে পারে না। তাছাড়া জিনগত কারণ, পরিবেশে ভাইরাসের আক্রমণ ইত্যাদি কারণেও অনেক সময় টাইপ-১ ডায়াবেটিস হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এর পিন পয়েন্ট কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের অনেক কারণই হতে পারে যেমন অতিরিক্ত ওজন, অতিরিক্ত মেদ এবং শারীরিক অকর্মণ্যতা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের অনেক বড় কারণ। অতিরিক্ত ওজন কখনো কখনো শরীরের ইনসুলিন ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। পেটের অতিরিক্ত চর্বি ইনসুলিন ক্ষরণের জন্য একটি রিস্ক ফ্যাক্টর। এক্ষেত্রে শরীরের বিএমআই (BMI) পরীক্ষা করে নেওয়াটাও অতীব জরুরি। যখন পাকস্থলী পেশি এবং রক্ত কোষ ইনসুলিন ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে না ঠিক তখন থেকেই টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ গুলো দেখা যেতে শুরু করে। জিনগত বৈশিষ্ট্যও ডায়াবেটিস হওয়ার অন্যতম কারণ। যেমন আফ্রিকান আমেরিকান এবং ইন্ডিয়ান আমেরিকানদের টাইপ টু ডায়াবেটিসের প্রবণতা অনেক বেশি থাকে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের অমরার মাধ্যমে শিশু খাবার পায়। কিন্তু এই অমরা থেকে ক্ষরিত হরমোন ইনসুলিন উৎপাদনকে ব্যাহত করে। গর্ভাবস্থায় সব মায়েদেরই একই অবস্থা হয়। কেউ কেউ এই ইনসুলিনের কম ক্ষরণকে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপাদন করে ওভারকাম করতে পারলেও অনেকেই পারে না। আবার অতিরিক্ত ওজনও গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী।
জেনেটিক মিউটেশন, অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ এবং কিছু ঔষুধও ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে। মনোজেনিক ডায়াবেটিস নামের একটি প্রকার আছে যেটি শুধু ঘটে DNA এর কোনো একটি জিনের মিউটেশন এর কারণে। জিনের এই মিউটেশন সাধারণত ফ্যামিলিগত কারণে ঘটে কিন্তু অনেক সময় নিজ থেকেও ঘটতে পারে। বেশিরভাগ মিউটেশনই অগ্নাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। সিস্টিক ফাইব্রোসিস নামের বংশগতিয় রোগের কারণেও ইনসুলিন উৎপাদন কমে যায়।
হেমাক্রোমোটোসিসে আক্রান্ত রোগীদের দেহে অত্যধিক পরিমাণ আইরন জমা হয়। এই জমাকৃত আইরন প্রথমে ইনসুলিন উৎপন্নকারী অগ্নাশয়কে এবং পরবর্তীতে দেহের প্রায় সব অঙ্গকে শেষ করে দেয়।
ডায়াবেটিসের জন্য হরমোনাল রোগগুলোও দায়ী। এসব রোগ কিছু নির্দিষ্ট হরমোন অত্যধিক পরিমাণে উৎপন্ন করে যেগুলো পরবর্তীতে ইনসুলিন ক্ষরণকে কমিয়ে দেয়। তাছাড়া অগ্নাশয়ের ক্যান্সার, ট্রমা ইত্যাদি রোগ ইনসুলিন উৎপন্নকারী বেটা সেলের ঘাটতি তৈরি করে। ডায়াবেটিসের জন্য এসব রিস্ক ফ্যাক্টরের পাশাপাশি কিছু ঔষধও কারণ হিসেবে কাজ করে। যেমন ভিটামিন B-3, ডাই-ইউরেটিক (মূত্র বর্ধনকারী) ইত্যাদি।
ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ( টাইপ-১ এবং টাইপ ২)
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হলো একমাত্র ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়া। তাছাড়া নিয়মিত ব্লাড সুগার টেস্ট এবং কার্বোহাইড্রেট টেস্ট করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অগ্নাশয় প্রতিস্থাপন বা অগ্নাশয়ের আইল্যাটস কোষ প্রতিস্থাপন একটি স্থায়ী চিকিৎসা হতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা অনেকাংশেই লাইফস্টাইলের উপর নির্ভর করে। তবে রক্তের নিয়মিত সুগার এবং কার্বোহাইড্রেট টেস্ট করতে হবে। ব্লাড সুগার লেভেল কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে কোন খাবার খেলে ব্লাড সুগার লেভেল বেড়ে যায় সেসব আগে চিহ্নিত করতে হবে। তার জন্য প্রথম দিকে দিনে কয়েকবার ব্লাড সুগার টেস্ট করানো জরুরী। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। বিভিন্ন ধরনের ইনসুলিন যেমন শর্ট অ্যাক্টিং ইনসুলিন বা রেগুলার ইনসুলিন, দ্রুত কাজ করে এমন রেপিড অ্যাক্টিং ইনসুলিন, দীর্ঘ সময় কাজ করে লং অ্যাক্টিং ইনসুলিন যার যার প্রয়োজন ও ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী টাইপ-১ এর ডায়াবেটিস রোগীদের নিতে হয়। সাধারণভাবে বলতে গেলে একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ডায়েট এবং ব্যায়াম ছাড়া তার রোগ কমানোর কোন উপায় নেই। সেই সাথে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাটাও তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত ওজন কমানোর জন্য বিভিন্ন ওয়েট লস সার্জারি রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি ওজন এবং চর্বি কমাতে চাইলে এসব সার্জারি নেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি ডায়াবেটিস প্রতিরোধের যেটি প্রধান কারণ সেটি হল কোনভাবেই ধূমপান করা যাবে না। এই কারণটিকে না মেনে ডায়াবেটিস হওয়ার অন্যান্য কারণগুলোকে নিজের জীবনে যথাযথভাবে কন্ট্রোল করে মেনে চললেও খুব একটা লাভ হবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ১৯৮০ সালে বিশ্বে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষ ছিল ১৮০ মিলিয়ন। ২০১৪ সালে সেই সংখ্যাটা হয় ৪২২ মিলিয়ন। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর চেয়ে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এই সংখ্যাটা খুবই দ্রুত বাড়ছে। অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হওয়া, হার্ট ফেলিওর, স্ট্রোক এবং মানবদেহের নিম্নাঙ্গের রোগ গুলোর একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস। ২০১৯ সালে ডায়াবেটিস ছিল বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর নবম কারণ। ২০১৪ সালে ১৮ বছর বয়সি এডাল্টদের ৮.৫% ছিল ডায়াবেটিস আক্রান্ত। ২০১৯ সালে ১.৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর সরাসরি কারণ ছিল ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পাঁচ উপায়
১. অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ
আমেরিকান ডায়াবেটিস এসোসিয়েশনের তথ্যমতে ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের শরীরের পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ ওজন কমানোর মাধ্যমে ডায়াবেটিসকে আগাম প্রতিরোধ করে। আপনি চাইলেই খুব কম সময়ের ভিতর আপনার শরীরের ওজন কমাতে পারবেন না। তার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট একটি টার্গেট ঠিক করা। যেমন আপনি এক সপ্তাহের মধ্যে চাইলে এক থেকে দুই কেজি ওজন কমাতে পারেন। এর পরের সপ্তাহে আরেকটু বেশি টার্গেট ফিক্সড করলেন। এভাবে টার্গেট ঠিক করে আপনাকে ওজন কমাতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে ডায়াবেটিস হওয়ার আশংকা অনেকাংশেই কমে যায়।
২. শারীরিকভাবে কর্মঠ থাকা
এর অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ আসবে সেই সাথে রক্তের মধ্যে থাকা ব্লাড সুগার লেভেল অনেক কমবে। আপনার শরীরের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়বে। শারীরিকভাবে কর্ম থাকার কিছু উপায় হতে পারে যেমন-
এরোবিক এক্সারসাইজ
এরোবিক এক্সারসাইজ বলতে বুঝায় খুব জোরালোভাবে হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং করা, সাঁতার কাটা ইত্যাদি। বিশেষ করে শরীরের জন্য সাঁতার এবং হাটা খুবই কার্যকরী দুটি ব্যায়াম। খুব কম সময়ের মধ্যে এই দুটি ব্যায়াম চাইলে আপনার শরীরের ওজন অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। আপনার পছন্দমত দিনের কিছু সময় আপনি এসব ব্যায়ামে কাটাতে পারেন। আপনার ডায়াবেটিস হওয়ার রিস্ক ফ্যাক্টর অনেক কমে যাবে।
রেসিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ
রেসিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ বলতে বুঝায় জিমনেশিয়াম এর ইনডোর ব্যায়ামগুলো। যেমন ভারউত্তোলন, জগিং ইত্যাদি। এসব ব্যায়াম আপনাকে দিনের অধিকাংশ সময়ই কর্মঠ রাখবে। সেই সাথে আপনার শারীরিক শক্তি অনেকক্ষণ বাড়িয়ে দিবে।
নিষ্ক্রিয়তাকে ভেঙে ফেলা
যেমন আপনি দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছেন। আপনি যদি প্রতি ৩০ মিনিট পরপর একটি করে ব্রেক নিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করেন বা কোন একটা হালকা কাজ করেন তাহলে এসব কাজ আপনার ব্লাড সুগার অনেক কমাতে সাহায্য করবে।
৩. স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া
আপনার ডায়েটের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেলস এবং কার্বোহাইড্রেট উদ্ভিদ আপনাকে দিতে পারে। আপনার শরীরের শক্তির উৎস স্টার্চ এবং শর্করা রয়েছে কার্বোহাইড্রেটে, সেই সাথে ফাইবারও। উদ্ভিদ থেকে পাওয়া ডায়েটারি ফাইবার বা রাফেজ আপনার শরীর শোষণ করতে পারে না। তাই রাফেজ আপনার শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার আপনার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
ফাইবার জাতীয় খাদ্যের সুবিধা
- ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যেমন টমেটো, গোলমরিচ এবং গাছের ফল শরীরের ওজন কমায়
- স্টার্চ (এক ধরনের খাদ্য উপাদান যেটি শরীরে চিনির পরিমাণ বাড়ায়) বিহীন ফুলকপি, সবুজ শাকসবজি আপনার দেহের জন্য আবশ্যক।
- সীম জাতীয় সবজি, মটরশুটি, ছোলা, ডাল দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সেই সাথে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়
- শরীরের চিনি পরিশোষণকে কমিয়ে ব্লাড সুগারকে নিম্ন রাখে।
- শরীরের ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল পরিশোষণে বাধার সৃষ্টি করে
- শরীরের অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে যেসব প্রদাহ, ব্লাড প্রেসার এবং হার্টের রোগের জন্য দায়ী
- ফাইবার জাতীয় খাদ্য সমূহ তাড়াতাড়ি ক্ষুধা নিবারণ করে ফেলায় আপনার গ্রহণকৃত খাবারের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে খারাপ কার্বোহাইড্রেট বিশিষ্ট খাবার গুলো যেমন ফ্রুট জুস, পাস্তা, বিভিন্ন জাঙ্ক ফুড, বার্গার ইত্যাদি যেগুলোতে আসলে ফাইবার তেমন নেই সেসব খাবার এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন।
৪. স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার
ডায়াবেটিসের কারণে চর্বিযুক্ত খাবার কম খেতে বারণ করা হলেও আপনার শরীরের শক্তির প্রধান উৎস হল চর্বি। কিন্তু সেই চর্বিযুক্ত খাবারের মধ্যে কোন খাবারে আসলে ভালো ফ্যাট তথা অসম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে তা আপনাকে বাছাই করতে হবে। মানুষের শরীরের কোলেস্টেরলের মধ্যে কিছু রয়েছে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল এবং কিছু ক্ষতিকর কোলেস্টেরল। কিন্তু দুই কোলেস্টেরলই আসলে চর্বি। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল হার্ট এবং রক্তনালীর জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দেহের জন্য উপকারী কোলেস্টেরলযুক্ত কিছু খাবার
- জলপাই, সূর্যমুখী, কুসুম ফল এবং ক্যানোলা অয়েল
- বাদামের মধ্যে যেমন কাজুবাদাম, চীনা বাদাম এবং কুমড়ার বীজ ইত্যাদি
- বিভিন্ন তেল জাতীয় মাছ যেমন স্যামন (সামুদ্রিক মাছ), সার্ডিন (সামুদ্রিক পোনামাছ), টুনা ইত্যাদি
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ক্ষতিকর ফ্যাট পাওয়া যায় বিভিন্ন ডেইরি পণ্য এবং মাংসে। তাই এসব খাবার সামগ্রিক খাদ্যতালিকার খুব কম অংশেই থাকা উচিত।
৫. ফ্যাড ডায়েট এড়িয়ে চলা
অনেক ফ্যাড ডায়েড যেমন গ্লাইক্যামিক ইনডেক্স, প্যালিও, কেটো ডায়েট আপনাকে ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে কিন্তু এসবের উপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করা যাবে না। আপনাকে একটি দীর্ঘমেয়াদী ডায়েটারি টার্গেট তৈরি করতে হবে। যার জন্য আবশ্যম্ভাবী হল আপনার অভ্যাস। খাবারের প্লেটকে আপনার তিনভাগে সাজাতে হবে। যার এক অংশে থাকবে ফ্রুট এবং স্টার্চবিহীন শাকসবজি। এক অংশে থাকবে খাদ্যশস্য তথা ভাত। অন্য অংশ আপনি প্রোটিন জাতীয় খাবার কোন কিছু রাখতে পারেন। যেমন সীম জাতীয় খাবার, তেলযুক্ত মাছ এবং চর্বি বিহীন মাংস। দিনশেষে আপনার ভালো অভ্যাসই আপনার স্বাস্থ্যসুখের প্রধান নিয়ামক।
আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরো আর্টিকেল
- মুখের ব্রণ-ঘরোয়া পদ্ধতিতে শতভাগ কার্যকর উপায়ে দূর করার উপায়
- চোখ ভালো রাখার এবং চোখের সমস্যা প্রতিকারের কিছু কার্যকরী উপায়
Q - 1 : ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা
- অসুস্থ খাবার খাওয়া বাদ দিতে হবে। একটু আগেই যে সমস্ত খাবারগুলোর কথা বললাম
- খাবার খেতে হবে পরিমিত। কমও না বেশিও না। কম খেলে ঘাটতি হবে আর বেশি খেলে বাড়তি হবে।
- হয় কায়িক শ্রম করতে হবে, কায়িক শ্রমের সুযোগ না থাকলে ব্যায়াম করতে হবে।
- দুনিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা একদমই করা যাবে না। সর্বদা আখিরাতমুখী চিন্তা করতে হবে। ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা যাবে না। ভবিষ্যত সৃষ্টিকর্তা দেখবেন। আপনি বেচে থাকলেও যে খুব বেশি করে ফেলবেন আর মারা গেলেও যে পরিবার তথা সন্তান সন্ততি একদম অসুবিধায় পড়ে যাবে তা কিন্তু না। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তিই মানুষের অসুস্থতার অর্ধেক নিরাময় করে।